একটা লোক আমার স্ত্রীর নাম্বারে প্রতিদিন…
ইয়াছিন নাইম১৩ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়াএকটা লোক আমার স্ত্রীর নাম্বারে প্রতিদিন ফোন দেয়।
ফোনটা সাইলেন্ট করা থাকে। যাতে আমি টের না পাই।
আমার মনে হয় মেহেরজান রাতে ঘুমায় না। চোখ বন্ধ করে কল আসার অপেক্ষা করতে থাকে।
এত রাতে সে কার সাথে কথা বলে?
আর ওই নাম্বার "বাবা" নামে সেইভ করা কেন?
আমি তো জানি ওর বাবা এক মাস আগে মারা গেছেন। তাহলে নতুন বাবা এলো কোত্থেকে?
ব্যাপারটা খেয়াল করেছি সপ্তাহখানেক হলো। তারপর থেকে রাতে ঘুম হয় না। ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকি।
মেহেরজান আমাকে বিয়ে করেছিল সবার অমতে।
ওর বাবা হুমকি দিয়েছিলেন, আমাকে বিয়ে করলে মেয়েকে ত্যাজ্য করবেন। মেহেরজান বাবার অট্টালিকা ছেড়ে এক কাপড়ে আমার সাথে চলে এসেছিল।
সেই মেহেরজান এখন অন্য লোকের সাথে পরকীয়া করবে? এটা আমি মানতেই পারছিলাম না। তাই তো এক সকালে মেহেরজান যখন ঘুমে বুঁদ, তখন তার মোবাইল চেক করলাম।
এভাবে চোরের মতো নিজের স্ত্রীর মোবাইল দেখতে অপরাধ বোধ হচ্ছিল। কিন্তু এই রহস্য আমাকে গিলে খাচ্ছে। তাই কললিস্ট চেক করলাম। আর তাতেই বেরিয়ে এলো এমন এক সত্য, যা আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি।
পরদিন মেহেরজানের ঘুম ভাঙলো বেলা বারোটায়।
যে মেয়েটা সকালের নাশতার জন্য আমাকে জ্ঞান দিত। সে নিজেই আজকাল নাশতা করছে না। এক সপ্তাহে তার ওজন কমেছে পাঁচ কিলোগ্রাম।
মেহেরজান আমাকে বসে থাকতে দেখে বলল,
"তুমি অফিসে যাওনি?"
"ছুটি নিয়েছি।"
"কেন?"
জবাব দিলাম না। মেহেরজানের গা ঘেঁষে বসে তার হাতটা আলতো করে ধরলাম। আগে এমন করলে মেহেরজান আমার বুকে মাথা রাখতো। আজ তা-ও করল না।
প্রশ্ন করলাম,
"তোমার বাবার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল?"
মেহেরজান চমকে আমার দিকে তাকালো। ওর সাথে আমার আট বছরের সম্পর্ক। এত বছরে একবারও তার এমন দৃষ্টি দেখিনি। আজ যেন তার চোখে রক্ত ঝড়ছে। হাতটা কাঁপছে থরথর করে। শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরলাম,
"মেহেরজান, তুমি ঠিক আছো তো?"
"হুমমম?" বলে প্রশ্নবোধক ভঙ্গিতে তাকালো আমার দিকে। যেন সে কিছুই জানে না। একসময় এই মেয়েই আমাকে গুছিয়ে, পরিপাটি করে রাখত। এখন তার চুলগুলোও রুক্ষ।
আমার মাথায় এখন একটাই প্রশ্ন। কীভাবে এই ফোনকলের হাত থেকে মেহেরজানকে রক্ষা করা যায়?
হঠাৎ এলো বুদ্ধিটা। সাবধানে ওর মোবাইল থেকে সিম খুলে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। মেহেরজান ব্যাপারটা খেয়াল করেনি। রাতের খাবার খেয়ে প্রতিদিনের মতো শুয়ে পড়েছে। আমি তার পাশে চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান ধরলাম।
রাত যত গভীর হচ্ছিল, ততই যেন বাড়ছিল মেহেরজানের অস্বস্তি। বারবার এপাশ ওপাশ করতে লাগলো। টের পেলাম কয়েকবার উঠে বসেছেও। হয়তো কিছু একটার অপেক্ষা করছে।
এদিকে আমি তো জানি ওর ফোনটা আজ ভাইব্রেশন করবে না। সুতরাং আজকের জন্য আমি নিশ্চিন্ত। মেহেরজানকে কলের হাত থেকে বাঁচাতে পেরে আনন্দ লাগছিল। কিন্তু সেই আনন্দ বেশি সময় স্থায়ী হলো না।
শেষরাতের দিকে আমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমানোর চিন্তা করছিলাম। কারণ আমি জানি আজ কল আসবে না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে টেবিলের উপর রাখা মেহেরজানের ফোনটা ভাইব্রেশন করতে শুরু করল।
টের পেলাম আমার পুরো শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। হৃদপিণ্ডে শুরু হয়েছে তুমুল ঝড়।
এটা কীভাবে সম্ভব?
আমি নিজের হাতে সিম খুলেছি।
তাহলে নেটওয়ার্ক ছাড়া মোবাইলে কল আসলো কীভাবে?
মেহেরজান সতর্ক ভঙ্গিতে রিসিভ করেছে ফোনটা। তারপর চুপিচুপি বেরিয়ে গেছে। আমার মনে হলো যেন স্বপ্ন দেখছি। তাড়াহুড়ো করে বাথরুমে ঢুকে মুখে পানির ঝাপটা মারলাম।
না, স্বপ্ন নয়। বাস্তবেই এসব ঘটছে।
কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?
চুপিচুপি বসার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখি মেহেরজান নিচু আওয়াজে ফোনে কথা বলছে। দূর থেকে সবকিছু শোনা যায় না। শুধু এতটুকু বুঝেছি, মেহেরজান বলছে,
"বাবা তুমি তাড়াতাড়ি এসো। আমি তোমার জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করি। তোমার প্রিয় বিফ বিরিয়ানি রান্না করে রেখেছি।"
আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। মেহেরজান কী বলছে এসব?
রান্নাঘরে ঘরে গিয়ে দেখি পাতিলে ভাত, তরকারি ইত্যাদি রাখা আছে। কোথাও বিরিয়ানি নেই। লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে মনেমনে ভাবলাম বেঁচে গেছি। এসব হয়তো মেহেরজানের মনের ভুল। হয়তো বাবার মৃত্যু মেনের নিতে না পেরে এসব আবুলতাবুল বলছে।
কিন্তু ফ্রিজ থেকে পানি খেতে গিয়ে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
ফ্রিজের ভেতরে একটা ট্রান্সপারেন্ট বাটিতে কিছু একটা রাখা। সেটা বের করে দেখি বিরিয়ানি! বড়োবড়ো বিফের টুকরো উঁকি দিচ্ছে সেখান থেকে!
আমার বোধ-বুদ্ধি সব লোপ পেতে লাগলো। কী করব বুঝতে পারছি না। হঠাৎ মনে হলো ডাস্টবিন খুঁজে দেখি।
সাদা টাইলসের উপর উল্টো করে ফেলে দিলাম ডাস্টবিনটা। সেখানে ভাঙা ডিমের খোসা, নুডলসের প্যাকেট, মাছের কাঁটা, নষ্ট টমেটো সব আছে। নেই শুধু একটা জিনিস। মেহেরজানের সিম। অথচ আমি নিজের হাতে ওটা ডাস্টবিনে ফেলেছিলাম। তার উপর খবরের কাগজ দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলাম যাতে মেহেরজানের চোখে না পড়ে।
তারপরও ওটা মোবাইলে গেল কীভাবে?
পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম।
মেহেরজান এসে দাঁড়ালো আমার সামনে। তার চোখের নিচে কালি পড়েছে। গলায় দুর্বলতার ভাব। বলল,
"ওরেঞ্জ জুস খেয়েছ কোনোদিন?"
আমি টাই বাঁধছিলাম। প্রশ্ন শুনে টাই হাত ফসকে পড়ে গেল৷ শুনতে ওরেঞ্জ জুস সামান্য একটা জিনিস। কিন্তু আমার কাছে সেটা সামান্য নয়। কারণ আমার শ্বশুরের মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে আমি তাকে ওরেঞ্জ জুস খাইয়েছিলাম।
এক মাস আগের কথা।
তখন নতুন নতুন বিয়ে করেছি। আমার মতো সামান্য একজনের সাথে মেহেরজান সংসার করছে এটা তার বাবা মেনে নিতে পারছিলেন না।
একদিন গোপনে ডাকলেন তিনি।
মেহেরজানকে না জানিয়ে দেখা করতে গেলাম। খুব শান্তভাবে তিনি আমাকে বসালেন। তারপর বুঝিয়ে বললেন যেন তার মেয়েকে ছেড়ে দেই। বিনিময়ে আমার যা ইচ্ছে পূরণ করবেন।
আমি বললাম কিচ্ছু চাই না। শুধু মেহেরজান চাই। তিনি বললেন,
"তুমি জানো না ছেলে, আমার কত ক্ষমতা।"
আমার মোবাইলে কল এলো। দেখি বসের কল। তিনি বললেন,
"রিসিভ করো।"
বস ফোনে জানালেন, "উনি যা বলে মেনে নাও। এতে তোমারই ভালো।"
ফোন কোটে দিলাম। বুঝলাম আমার মতো সামান্য একজনের এত ক্ষমতা নেই যে তার সঙ্গে লড়ব। কিন্তু মেহেরজানকেও ছাড়তে পারব না। পৃথিবীর সবকিছু একপাশে রেখে অন্যপাশে শুধু মেহেরজান থাকলেও আমি শুধু তাকেই বেছে নেব।
ওদিকে শ্বশুর আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবেন না। ঠাণ্ডা মাথায় একটা বুদ্ধি সাজালাম। তাকে বললাম যেন পরদিন আবার দেখা করেন। আমি জানাবো আমার কী চাই।
সেই রাতে মেহেরজান ঘুমিয়ে পড়ার পর ইন্টারনেট ঘাটতে শুরু করলাম। আমি জানতাম শ্বশুরের হার্টের অসুখ আছে। তাইতো ইন্টারনেট ঘেঁটে এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম, যা একজন হার্টের রোগীর প্রাণ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
পরদিন আগেভাগে গিয়ে বসে রইলাম রেস্তোরায়। লোকচক্ষুর আড়ালে ওরেঞ্জ জুসে ঢেলে দিলাম সেই বিশেষ জিনিসটা। জুসটা খেলেন তিনি। তাকে জানালাম তিনদিন পর আমার অ্যাকাউন্টে এক কোটি টাকা দিতে হবে। তবেই তাঁর মেয়েকে সসম্মানে বাসায় দিয়ে আসবো।
টাকার প্রতি আমার কোনো লোভ নেই। আমার শুধু প্রয়োজন কিছু কিছুটা সময়। সেটা পেয়েও গেলাম।
তিনি হাসি মুখে ফিরে গেলেন। এবং সেটাই হলো তার জীবনের শেষ হাসি। রাতেই তার শেষ নিঃশ্বাস পড়ল। সবাই জানলো হার্টের অসুখে মারা গেছেন। শুধু আমি জানতাম আসল ব্যাপারটা।
এছাড়া আমার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। মেহেরজানের জন্য আমি যেকোনো কিছু করতে পারি। এমনকি, খুনও।
এতদিন পর মেহেরজানের মুখে ওরেঞ্জ জুসের কথা শুনে মাথাটা ঝিম ধরে গেল। তবে মেহেরজান ব্যাপারটাকে হালকা করে দিয়ে বলল, "তোমার পছন্দ না হলে জোর করে খাওয়াবো না।"
মনে হলো যেন বুকের উপর থেকে পাথর সরে গেছে। মেহেরজান এমনিই বলছিল। আর আমি কী না কী ভাবছিলাম!
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সবার আগে একটা কাজ করলাম। মেহেরজানের অজান্তে তার ফোনে কল রেকর্ডিং অন করে দিলাম। সেই রাতেও মেহেরজানের মোবাইলে কল এলো। পরদিন সকালে অডিও ফাইলটা ট্রান্সফার করলাম আমার মোবাইলে।
অফিসে বসে সেটা শুনতে গিয়ে আমার দম আটকে গেল।
ফোনের ওপাশ থেকে একটা কর্কষ আওয়াজ আসছিল। মেহেরজান বলছিল,
"বাবা তুমি কবে আসবে? আমি তোমার জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করি।"
ওপাশ থেকে কণ্ঠটা বলছিল,
"আমি আর আগের মতো চলতে পারি না। প্রতিদিন যখন তুই ফোন ধরিস, আমি একটু একটু করে এগোই। আর অপেক্ষা করতে হবে না। কাল রাতে ফোন ধরলেই আমি তোর ঘরে পৌঁছে যেতে পারব।"
"তাড়াতাড়ি এসো বাবা। তোমার জন্য বিফ বিরিয়ানি রেখেছি।"
"আসব। সেদিন তোর জামাইকে পরীক্ষা করতে গিয়েছিলাম। তুই তো আমার মেয়ে। একটা ভুল করেছিস বলে কি ফেলে দিতে পারি? তাইতো গিয়েছিলাম জামাইকে পরীক্ষা করতে। যাতে সে পাশ করলে তোদেরকে মেনে নিতে পারি। কিন্তু সে আমাকে জুস খাওয়ালো। তুই এক গ্লাস ওরেঞ্জ জুস বানিয়ে রাখিস। আমি নিজ হাতে জামাইকে খাওয়াবো।"
এইটুকু শুনেই ইয়ারফোনটা এক টানে কান থেকে খুলে ফেললাম।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখি ডায়নিং টেবিলে ওরেঞ্জ জুস বানিয়ে রাখা।
মেহেরজানের মোবাইল থেকে সিম খুলে টুকরো টুকরো করে ফেললাম। মেহেরজান সেটা টের পেলো কি না জানি না। এমনিতে সে সাধারণত ফোন দেখে না। তাই ফোনটাও অফ করে দিলাম।
আজ রাতে কোনোভাবেই কলটা আসবে না। মেহেরজান চাইলেও সিম চালু করতে পারবে না। নিশ্চিন্ত মনে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলাম।
শেষরাতের দিকে যখন মেহেরজান উঠে বসেছে, আমিও বসলাম। বললাম, "ঘুমাও। আজ আর কল আসবে না।"
"তুমি কী করেছ?"
"যা করেছি, আমাদের ভালোর জন্যই করেছি। শুয়ে পড়ো।"
মেহেরজান বসে রইল। উঠে গিয়ে টেবিল থেকে মেহেরজানের ফোনটা তুলে এক আছাড় দিতেই সেটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ভেবেছিলাম মেহেরজান চমকে যাবে। কিন্তু আজ সে অদ্ভুত রকম শান্ত। তার চেহারায় মৃদু তাচ্ছিল্যের হাসি।
আমি ভেবেছিলাম মেহেরজানের ফোন ভাঙলেই বিপদ শেষ। কিন্তু ঘরে যে আরো একটা ফোন আছে সেটা আমার ভাবনায়ও আসেনি। ফোনটা আমার বালিশের নিচে রাখা। সেটাই বেজে উঠল আচমকা।
মেহেরজান বালিশের নিচ থেকে বের করতেই দূর থেকে দেখলাম "বাবা" নামটা জ্বলজ্বল করছে। এক লাফে সেটা ছুঁতে যাব, তার আগেই মেহেরজান রিসিভ করে ফেলল।
"হ্যালো, বাবা?"
ঠিক কখনি কাঁধের কাছে গরম নিঃশ্বাস টের পেলাম।
মেহেরজানের দিকে তাকিয়ে দেখি আনন্দে তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। অস্ফুট স্বরে বলল,
"বাবা, তুমি এসেছ!"
ভয়েভয়ে পেছনে ফিরে তাকিয়েছি।
দেখি আমার শ্বশুর দাঁড়িয়ে। তার চেহারায় মৃদু হাসি। হাতে একটা জুসের গ্লাস। অদ্ভুত, অতিপ্রাকৃত গলায় তিনি বললেন,
"হা করো জামাই। তোমার জন্য জুস এনেছি।"
ওরেঞ্জ জুস
ইয়াছিন নাইম