বই পড়ে কেঁদেছেন কখনো
ইয়াছিন নাইম১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬২ মিনিট পড়াবই পড়ে কেঁদেছেন কখনো? আমি না খেয়ে ছিলাম দুইদিন।
২০২০সালের কথা। খুব সম্ভবত মার্চ মাস। পড়তে শুরু করেছি বিশিষ্ট লেখক হুমায়ূন আহমেদ স্যারের একটি বই। শুরুর দিকটা একদমই ভালো লাগেনি। তবে একটু একটু করে বইয়ের গভীরে যাচ্ছিলাম আর কৌতূহল বাড়ছিল। একটা তীব্র কৌতূহল ছিল। বারবার ভাবছিলাম, কোথায় গেল ইমনের বাবা?
বইয়ের প্রায় মাঝখানে একবার সুপ্রভার মা রাগ করে বললেন, তোর মতো মেয়ের আমার দরকার নেই। তুই একটা কাজ কর, ছাদে উঠে যা। তারপর ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে যা।
আমি ভাবতেও পারিনি সুপ্রভা এমন করবে। সুপ্রভা যখন সত্যি সত্যি ছাদে উঠে গেল তখন আমি মনে মনে বিড়বিড় করছিলাম, সুপ্রভা, তুমি এমন করো না। প্লিজ সুপ্রভা, প্লিজ!
কিন্তু সুপ্রভা কি আমার কথা শুনতে পাবে? হুমায়ূন স্যার বহু বছর আগে যা লিখে গেছেন তা কি আমার আবদারে পরিবর্তন হয়ে যাবে? না, কখনোই যাবে না। সুপ্রভা আমার কথা শুনল না। সে সত্যি সত্যি ছাদে গেল। আমি তখনও আল্লা আল্লা করছিলাম। আল্লাহ্, সুপ্রভা যেন লাফ না দেয়!
কিন্তু সেদিন আমার দোয়া কবুল হয়নি। সুপ্রভা সত্যি সত্যি ছাদ থেকে লাফ দিলো!
সুপ্রভা মারা যায়।
আমি কান্না করছিলাম খুব। ইচ্ছে করছিল হাতের বইটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলি। জ্বালিয়ে দেই। কিন্তু তা করিনি। ভেবেছিলাম হুমায়ূন স্যার আমাকে সান্ত্বনা দেবেন। হয়তো তিনি এমন কিছু বলবেন যাতে আমার মন ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু না। হুমায়ূন স্যারও সেদিন আমার পক্ষে ছিলেন না। তিনি সান্ত্বনা তো দিলেনই না বরং বললেন,
ছোট্ট সুপ্রভা। তোমার প্রসঙ্গ এই উপন্যাসে আর আসবে না। কারণ তোমার জন্যে কেউ অপেক্ষা করে থাকবে না। মৃত মানুষদের জন্যে আমরা অপেক্ষা করি না। আমাদের সমস্ত অপেক্ষা জীবিতদের জন্যে। এই চরম সত্যটি না জেনেই তুমি হারিয়ে গেলে।
স্যারের কথা শুনে আমার এত এত রাগ হচ্ছিল যে, আমি উনাকে প্রচুর গালাগাল করেছিলাম। টানা দুইদিন আমি ভাত খাইনি। দিনেরাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে চোখের জল ফেলেছি। মাঝরাতে অন্ধকার ঘরের এক কোণে হাঁটুর ভাঁজে মুখ লুকিয়ে মেঝেতে বসে কেঁদে কেঁদে কাটিয়েছি। এরপর বহুদিন বইটির ঘোর কাটাতে পারিনি। এখনও পুরোপুরি পেরে উঠিনি। জানি না কোনোদিন পারব কি না।
একটি বইয়ের কাল্পনিক এক চরিত্র মানুষের বাস্তব জীবনে এতটা প্রভাব ফেলতে পারে তা আমাকে হুমায়ূন স্যার শিখিয়েছেন। স্যারের সেই বইটির নাম, “অপেক্ষা” আমার সবচে’ প্রিয় এবং সবচে’ ঘৃণিত একটি বই।
মো. ইয়াছিন