ছোটগল্প

আমি একজন চোর

ইয়াছিন নাইম২ অক্টোবর ২০২৬৬ মিনিট পড়া

আমি একজন চোর।

তারচেয়েও বড়ো কথা আমি একটি মেয়ে। ছেলেমানুষ চুরি করলে তাকে বলে চোর। কিন্তু মেয়ে চোর হলে তাকে কী বলে জানেন তো?

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। মেয়েমানুষ চুরি করলে তাকে বলে চোরনি। আমি সেটাই। মানুষের টাকাপয়সা, ধনসম্পদ চুরি করে খাওয়াই আমার পেশা। কিন্তু আজ আমি আমার জীবনের শেষ চুরি করতে যাচ্ছি। আজ যদি আমি সফল হই, তবে আজীবন পায়ের উপর পা তুলে কাটিয়ে দিতে পারব। আর যদি ব্যর্থ হই, তবে আজই হবে আমার জীবনের শেষ দিন।

আমি চুরি বিদ্যা শিখেছি আমার বাবার কাছ থেকে।

আমার বাবা ছিলেন মস্ত বড়ো চোর। এদেশের বাঘাবাঘা চোরেরা আমার বাবার কাছে এসে তালিম নিত। বাবা সবসময় বলতেন, চুরি করা এক ধরণের শিল্প। যে যত গোপনে চুরি করতে পারে, সে তত বড়ো শিল্পী।

কিন্তু আমি কখনোই নিরাপদে চুরি করতে পারতাম না। প্রতিবারই লোকের কাছে ধরা পড়তাম। মেয়েমানুষ বলে কেউ গায়ে হাত তুলত না ঠিকই। আবার সুযোগে পেলে কেউ ছেড়েও দিত না।

একবার এক গৃহিণীর গয়না চুরির দায়ে ধরা পড়লাম। তখন আমি সদ্য ফোটা ফুলের মতো টাটকা যুবতি। বিবাহ উপযুক্ত মেয়েমানুষ চুরি করতে এসে ধরা পড়েছে এ-কথা মুহূর্তের মধ্যে দূর দূর পর্যন্ত রটে গেল। ততক্ষণে আমাকে গাছের সাথে বেঁধে ফেলা হয়েছে। দুপুরবেলা আমার চোখের সামনে নতুন ব্লেড কিনে আনা হলো। আমার চারপাশে অন্তত একশোজন মানুষ দাঁড়িয়ে মজা দেখছে। নেতাগোছের একজন এগিয়ে এল আমার সামনে। তার হাতে নতুন ব্লেড। সেই ব্লেড দিয়ে আমার মাথার সব চুল কেটে আমার সারা গায়ে আবর্জনা ঢেলে দিলো লোকটা।


ঘরে ফেরার পর বাবা আমার এই অবস্থা দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। আর আমার নিজের ওপর রাগ হচ্ছিল এই ভেবে যে, এত বড়ো একজন চোরের মেয়ে হয়ে আমি বারবার ধরা পড়ে যাচ্ছি! আমার ভেতরে জেদ ছিল। আমি আমার বাবার একমাত্র সন্তান। মেয়ে হয়েছি তো কী , আমিই আমার বাবার পেশা ধরে রাখব।

সেদিন রাতে বাবা আমার হাতে একটা কাঠের বাক্স তুলে দিলেন। আর তার সেই বিখ্যাত ডায়লগটা শেষবারের মতো বললেন,

"চুরি করা এক ধরণের শিল্প। যে যত গোপনে চুরি করতে পারে, সে তত বড়ো শিল্পী। বারবার ধরা খেয়ে গেলে শিল্পী হতে পারবি না। চুরি করতে হবে এমনভাবে যাতে কেউ ভাবতেও না পারে চুরিটা কখন হলো, কীভাবে হলো আর কে-ই বা চুরিটা করল। যেদিন তুই সত্যিকারের চোর হয়ে উঠতে পারবি, যেদিন তোর মনে হবে তুই সত্যিকারের শিল্পী হয়ে উঠতে পেরেছিস, সেইদিন এই বাক্স খুলবি।"

আমি অবাক হয়ে কাঠের বাক্সটা হাতে তুলে নিয়েছিলাম। সেদিন রাতেই ঘুমন্ত অবস্থায় বাবার মৃত্যু হলো।


এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ আটটি বছর। এতদিনে আমি অন্তত এক হাজার চুরি করেছি। শুরুর দিকে ধরা খেতাম ঠিকই। কিন্তু এখন আমি বেশ কৌশলী এবং সতর্ক। ধরাও খাই না খুব একটা।

এখন আমি একজন পরিপূর্ণ চোর, একজন দক্ষ শিল্পী। তাই বাবার দেওয়া সেই কাঠের বাক্সটা খুলেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম বাবা বোধহয় এই বাক্সে বহু মূল্যবান কোনো ধনরত্ন রেখেছে। কিন্তু না, তেমন কিছুই নয়, বাক্সের ভেতর পড়ে আছে একটি চিরকুট, কিছু কাগজপত্র আর একটি বিশাল বড়ো চাবি!

আমি জীবনে অনেক চাবি দেখেছি, বহু চাবি তো আমি নিজ হাতে বানিয়েছি। কিন্তু এরকম চাবি কোনোদিন দেখিনি। চাবিটা দেখতে কেমন যেন। অনেকটা ঘোড়ার মতো, চ্যাপ্টা, লোহার পাত দিয়ে বানানো। আমার ভীষণ অবাক লাগলো। চাবিই যদি এরকম অদ্ভুত হয়, এটার তালা না জানি কতটা অাজিব হবে!

চিরকুট খুলে দেখি বাবার হাতে লেখা, "চাবিটা হাতে পেয়েছিস? যদি তুই সঠিক পথে চলতে পারিস, তাহলে এই ঘোড়ার মতো চাবিই তোর ভাগ্য খুলে দেবে। ব্রিফকেসে রাখা কাগজপত্রে সব দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে। যা, এটাই তোর জীবনের শেষ চুরি। যদি সফল হোস, তাবে আর কোনোদিন পেটের দায়ে চুরি করতে হবে না। বাকি জীবনটা রাজার হালে কাটাবি। তবে সাবধান, তুই যেখানে যাচ্ছিস, সেখানে পদেপদে বিপদ দেখা দিবে, মৃত্যুর আশঙ্কাও থাকবে। ভয় পাবি না। সব বাধা বিপত্তি ডিঙিয়ে কাজটা করতে হবে। পারবি তো? আমি জানি তুই পারবি। তুই অবশ্যই পারবি।"

আমি ভীষণ অবাক হয়ে চিরকুটটা পড়া শেষ করলাম। ঘোড়ার মতো চাবিটা রাখলাম পকেটে। কাঠের বাক্স থেকে জরুরি কাগজপত্র নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে দিলাম।

চুরি যখন করবই, তবে আর দেরি কেন? এখনি বেরিয়ে পড়া যাক!


বিকেল ৫টা ৪৩মিনিট।

মান্ধাতার আমলের পুরনো লক্কড়-ঝক্কড় বাসটা বারদুয়েক ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। এটাই এখানকার শেষ বাস। আজ আর কোনো দূরপাল্লার যানবাহন এদিকে আসবে না।

টানা ছয় ঘন্টা ভাঙাচোরা বাসে যাত্রা করায় আমি বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। এখন বাস থেকে নেমে হাঁফ ছাড়লাম। কিন্তু এ-কী রে বাবা! এ কোথায় এসে পড়লাম আমি! সন্ধ্যা হয়নি এখনও অথচ চারিদিকে খাঁ খাঁ নিস্তব্ধতা! রাস্তার দু'পাশের দোকানপাট সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু একটি দোকান খোলা। সেটিও হয়তো এখনি বন্ধ হয়ে যাবে।

বাসে করে আমার সাথে যে শেষ যাত্রী এসেছিল, সেই লোকটি বাস থেকে নেমেই পায়ে হাঁটা পথ ধরে ছুটে চলে গেছে। আমার মনে একটু কৌতূহল জাগলো। সন্ধ্যে হওয়ার আগেই জায়গাটা এমন ফাঁকা হয়ে গেল কেন? রাত হলে এখানে কোনো সমস্যা হয় নাকি?

আমার একটু ভয়ও লাগছে। একে তো অচেনা অজানা জায়গা। তার উপর আমি একলা একটি মেয়েমানুষ। একটু পরেই রাত নামবে। চারপাশ যেরকম নিঃস্তব্ধ, যদি কোনো বিপদআপদ হয়! একবার ভাবলাম, চুরি করতে এসে নিজেই না চুরি হয়ে যাই আবার! ফের ভাবলাম, আমি নিজেই তো চুরনি, আমাকে চুরি করে এমন সাধ্য কার!

একবার ভাবলাম ফিরে যাব। বাবা সেই কবে কখন কী একটার সন্ধান পেয়েছিলেন, সেটা চুরি করতে পারলে হয়তো আমি লাভবান হতে পারি। কিন্তু সেই জিনিস কি এতটা বছর পরও আগের জায়গায় আছে? এরচে' বরং ফিরে যাই। আবার ভাবলাম, নাহ, এসেই যখন পড়েছি তখন কাজ শেষ করে তবেই ফিরব। এতে যদি আমার মৃত্যু হয়, তবে তাই হোক। আমি কিচ্ছু ভয় করি না। কিন্তু সমস্যা হলো, আজকের রাতটা পার করার জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে রাস্তায় তো আর রাত কাটানো যায় না!

ইতোমধ্যে চারপাশে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। যে একটি দোকান খোলা ছিল, সেটা এখনও খোলা। দোকানের ঝাঁপি অল্প একটু নামিয়ে ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে দোকানি। আমি ইতস্তত করতে করতে এগিয়ে আসছিলাম কিন্তু দোকানের সামনে এসে দাঁড়াতেই আমার ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। দোকানটা কাফনের! সাদাসাদা কাফন থরেথরে সাজানো। গোলাপজল, আগরবাতি এসবও আছে। একটা লোক, না না, লোক নয়, একটা অল্পবয়সি, হয়তো আমারই বয়সি এক যুবক বসে আছে দোকানে। ছেলেটা আমাকে দেখে যেন একটু বিস্মিত হলো। হয়তো ভেবেছে, এই ভরসন্ধ্যায় যুবতী মেয়েমানুষ কাফন কিনতে এসেছে কেন!

আমি দু' পা এগিয়ে গেলাম৷ যুবকটি একটি কাফন, একটি গোলাপজল, আর এক প্যাকেট আগরবাতি এগিয়ে দিয়ে বলল, "এখানে বেশিক্ষণ থাকবেন না। যেখান থেকে এসেছেন, দ্রুত সেখানে ফিরে যান।"

আমি বিব্রত হয়ে বললাম, "কিন্তু আমি এসব নিতে আসিনি।"

"তাহলে? কীজন্য এসেছেন এখানে?" বলে ছেলেটা এত কৌতূহলী হয়ে আমার দিকে কেন তাকালো সেটা আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। শুধু বললাম, "আমি আজকের রাতটা এখানে থাকতে চাই। আশপাশে কোনো হোটেল আছে?"

ছেলেটা ততক্ষণে জোরেজোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করেছে। আবার একটু আগুন জ্বালিয়ে আমার সামনে এনে ধরল। আমি অবাক হয়ে বললাম, "আরে আরে! আগুন আমার সামনে আনছেন কেন!"

"কারণ আমি আপনাকে পেত্নী ভেবেছিলাম।"

"কীহ! আমি কি দেখতে পেত্নীর মতো?"

"হ্যাঁ, আমি তো তা-ই ভেবেছিলাম। তা না হলে কি আর আয়াতুল কুরসি পড়তাম?"

এত বড়ো অপমান! রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে। তবুও নিজেকে সংযত করে বললাম, "এখন আমি বিপদে আছি। নইলে আমি আপনাকে দেখিয়ে দিতাম পেত্নী কাকে বলে।"

বলে আমি অনেকটা দূরে চলে এলাম। দরকার নেই এরকম ছেলের সাহায্য নেওয়া যে আমাকে এভাবে অপমান করে। আমি নাকি পেত্নী! খচ্চর বেটাছেলে!

ভেবেছিলাম এখানে মানুষজন না থাকলেও গাড়ির রাস্তা যেহেতু আছে, সন্ধ্যের পর এদিকে একজন মানুষ অন্তত এদিকে আসবে। কিন্তু অনেক রাত অবধি মানুষ তো দূর, একটা কুকুরের দেখাও মিলল না। হঠাৎ দেখি, সেই ছেলেটা দোকানের ঝাঁপি বন্ধ করে চলে যাচ্ছে। সত্যি বলতে, ছেলেটার প্রতি আমি রেগে থাকলেও তার ভরসায়ই এতক্ষণ এখানে একা দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছি। কিন্তু এখন সে চলে যাচ্ছে দেখে আমার ভীষণ ভয় হতে শুরু করল। যত রাগ ক্ষোভ বিসর্জন দিয়ে ঠিক করলাম, ছেলেটার কাছেই সাহায্য চাইব। কিন্তু যেতে হলো না। সে নিজেই আমার সামনে এসে বলল, "কোথায় যাবেন ঠিক করলেন? এখানে তো কোনো হোটেল পাবেন না। আশপাশে বাড়িঘরও নেই। এখানেই রাত কাটাবেন নাকি?"

বললাম, "আজকের রাতটা কাটিয়ে দেওয়ার মতো জায়গা কি কোথাও পাবো না?"

ছেলেটা একটু ভাবলো। তারপর বলল, "পাবেন। তবে একটিমাত্র ঘর। একঘরেই আমার সাথে রাত কাটাতে হবে।"

"মানে!" বলেই বিস্ফারিত চোখে ছেলেটার দিকে তাকালাম। "আপনি কি আমাকে ওরকম মেয়ে পেয়েছেন নাকি!"

"না না, আপনি ভুল বুঝছেন। আমি যেখানে থাকি সেখানে একটাই ঘর। তাই বলেছি, আপনি চাইলে আমার ঘরে আজকের রাতের জন্য আশ্রয় নিতে পারেন।"

"আপনার সাথে একঘরে! অসম্ভব!"

"তাহলে আমি দুঃখিত। আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারছি না। আজকের রাতটা এখানে রাস্তায়ই কাটাতে হবে। এখানে কিন্তু রাত বিরেতে ডাকাতেরা চলাফেরা করে। আপনি একলা মেয়েমানুষ। যেকোনো সময় বিপদ হতে পারে। এবার ভেবে দেখুন, আমার সাথে যাবেন? না কি এখানেই রাত কাটাবেন।"

ডাকাতের কথা শুনে আমার সত্যিই ভয় লাগলো। সত্যিই যদি ডাকাতের সামনে পড়ি তাহলে নিশ্চিত বিপদ হবে। তবে কি এই ছেলেটার সাথে যাওয়াই ঠিক হবে? কিন্তু ছেলেটার মনে যদি কোনো কুমতলব থাকে? এমনও তো হতে পারে, সে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য আমাকে ডাকাতের ভয় দেখাচ্ছে!

"কি হলো? যাবেন নাকি আমার সাথে?" বলে ছেলেটা আমার দিকে তাকালো। আমি একটু ভেবে বললাম, "যাব।"

চলবে...

(পরবর্তী অংশ কাল রাত ৯টায়। কেমন লাগছে চোরনির কথা? জানাতে ভুলবেন না কিন্তু! কমেন্টে চোরনির বন্যা হোক!)

সমাপ্ত
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

আরও গল্প

এমন আরও কিছু

সব গল্প
ছোটগল্প

কালকে এক রিকশাওয়ালা মামা বলতেছে

কালকে এক রিকশাওয়ালা মামা বলতেছে, "মামা, বিয়া করছেন?" বললাম, "না।" আমার দিকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকালো। "বিয়া করেন নাই? তাইলে তাড়াহুড়া কইরা বাসায় যাইয়া কী করবেন?" "বউ ছাড়া কোনো কাজ থাকতে পারে না?" "কী যে কন না মামা! বউয়ের চাইতে বড়ো…

১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিট পড়া
ছোটগল্প

একটা লোক আমার স্ত্রীর নাম্বারে প্রতিদিন…

একটা লোক আমার স্ত্রীর নাম্বারে প্রতিদিন ফোন দেয়। ফোনটা সাইলেন্ট করা থাকে। যাতে আমি টের না পাই। আমার মনে হয় মেহেরজান রাতে ঘুমায় না। চোখ বন্ধ করে কল আসার অপেক্ষা করতে থাকে। এত রাতে সে কার সাথে কথা বলে? আর ওই নাম্বার "বাবা" নামে সেইভ করা…

১৩ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ছোটগল্প

আমাদের বাড়িতে একটা দোষী পুকুর আছে

আমাদের বাড়িতে একটা দোষী পুকুর আছে। সেটার ভয়ে বাবা আমাদেরকে নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। এখন আবার সেখানে ফিরে যেতে হচ্ছে। বাবা যদি জানতে পারেন তাহলে ঘর থেকেই বেরোতে দিবেন না। তাই মিথ্যে বলে যাচ্ছি। বাবা জানে কক্সবাজার যাব। কিন্তু যাচ্ছি আমাদের গ্রামে। যে…

১২ অক্টোবর ২০২৬৮ মিনিট পড়া