আমার একটি গাড়ি কেনার শখ
ইয়াছিন নাইম৮ অক্টোবর ২০২৬৩ মিনিট পড়াআমার একটি গাড়ি কেনার শখ।
নতুন-পুরাতন যেমনি হোক, একটি গাড়ি আমার চাই।
একটা টিনের বাক্সে টাকা জমাতে শুরু করেছি। কাল চুপিচুপি খুলেছিলাম বাক্সটা।
ভেতরে কতগুলো পাঁচশো, হাজার টাকার নোট পড়ে আছে। সাথে একটা প্রতিজ্ঞাপত্র। সাদা কাগজে লেখা,
"আমার স্ত্রীর জন্য উপহার।"
আমি একটা বেসরকারি ব্যাঙ্কে চাকরি করি। বেতন যা পাই, কোনোমতে স্বামী-স্ত্রী দুজনের চলে যায়। এক বেডরুমের ভাড়া বাসায় থাকি আমরা। আমি আর আমার স্ত্রী মেহেরজান।
আমাদের বিয়েটা হয়েছিল ভীষণ অদ্ভুতভাবে।
মেহেরজান আশুগঞ্জে একটি হোটেলে কাজ করত। আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম সেখানে।
এক বিকেলে এলাকার লোকজন হোটেল ঘেরাও করল। অনেক অবিবাহিত ছেলেমেয়ে আটক হলো। মেহেরজান রুম পরিষ্কার করতে এসেছিল। লোকজন মেহেরজানের সাথে আমাকে আটক করল।
মেহেরজান অনেক চেষ্টা করেছে নিজেকে নির্দোশ প্রমাণ করার। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। রাতে একরকম জোর করে আমাদের বিয়ে দেওয়া হয়।
প্রথমে মাসখানেক মেহেরজান আমার সাথে কথাই বলেনি। তার ধারণা আমি ইচ্ছে করলে বিয়েটা ঠেকাতে পারতাম। ঠেকাইনি কারণ...
কারণ আমি তার সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।
এই এক্সিডেন্টলি বিয়ে হয়ে যাওয়ার জন্য মেহেরজান আমাকেই দোষারোপ করত। আমি কোনোদিন নিজেকে নির্দোশ দাবি করিনি। কারণ মেহেরজান যা মনে করে তা-ই সত্যি। মেহেরজানের মতো মেয়েকে হাতছাড়া করার ইচ্ছে আমার ছিল না। তাইতো অন্যায় সিদ্ধান্তটা মুখ বুজে মেনে নিয়েছিলাম।
মেহেরজান অল্পে তুষ্ট মানুষ। কোনোদিন কিছু আবদার করেনি। খুশি হয়ে যা দিতে পেরেছি, তাতেই তার আনন্দ।
ভেবেছিলাম এভাবেই আমাদের ছোট্ট সংসারজীবন চলবে।
কিন্তু একদিন...
তখন মেহেরজান নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
আমি বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলাম৷ হঠাৎ ভারী কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। ছুটে গিয়ে দেখি মেহেরজান বাথরুমে পড়ে আছে। মাথা ফেটে রক্ত পড়ছে গলগল করে।
বৈশাখ মাসের রাত।
বাইরে কালবৈশাখীর তাণ্ডব চলছে। মেহেরজানের মাথা কোলে নিয়ে বসে ছিলাম দুই ঘন্টা।
অ্যাম্বুলেন্স আসছে বলেছে। কিন্তু মফস্বলে ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে আসতে পাক্কা দুই ঘন্টা লাগলো।
ততক্ষণে মেহেরজান ব্যথায় নীল হয়ে গেছে। তার হাতগুলো কাঁপছে থরথর করে। তখন সে একটি কথাই বলছিল,
"আমার বাচ্চাকে বাঁচাও।"
হাসপাতালে পৌঁছাতে ভোররাত হয়ে গেল।
ডাক্তার বললেন, রোগীর কন্ডিশন খারাপ। আরো আগে নিয়ে আসা উচিত ছিল।
"কিন্তু আমার স্ত্রী-বাচ্চা বাঁচবে তো?"
"চেষ্টা করব। বাকিটা আল্লাহর হাতে।"
চলে গেলেন ডাক্তার। ফাঁকা করিডোরে দাঁড়িয়ে রইলাম একা। আমার হাতে তখনও মেহেরজানের শুকনো রক্ত লেগে আছে।
সকালে যখন মেহেরজানের সাথে দেখার করার সুযোগ পেলাম, তখন সে কোমলমতি শিশুর মতো শুয়ে আছে। আমার হাতটা ধরে বলল,
"আমার বাচ্চা কই, শাহের?"
"আরো আগে হাসপাতালে আসতে পারলে আমাদের বাচ্চাকে হারাতে হত না।"
মেহেরজান আর কোনো প্রশ্ন করল না। এমনকি, কথা বলাই বন্ধ করে দিলো।
এই ঘটনার জন্যও মেহেরজান আমাকে দায়ী করে। তাই আমাকে এড়িয়ে চলে। আমার সাথে এক বিছানায় ঘুমায় না। মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে শোয়।
আমাদের বাসার উল্টোদিকে এক সরকারি কর্মকর্তা থাকেন। প্রতিদিন সকাল-বিকাল তার প্রাইভেটকার বেরিয়ে যায় আবার আসে। ওই দুই সময় মেহেরজান চুপচাপ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে। ফ্যালফ্যাল করে দেখে গাড়িটা।
আমার জীবনে কোনো আফসোস নেই। ঘরে মেহেরজানের মতো বউ আছে। কোনোভাবে চলার মতো রোজগার আছে। জীবনে আরকিছু চাই না। আফসোস শুধু একটা জায়গায় রয়ে গেল।
আমার কোনো গাড়ি নেই।
যদি একটি গাড়ি থাকতো, তাহলে মেহেরজানকে সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারতাম।
ডাক্তার বলেছেন সময়মতো পৌঁছাতে পারলে হয়তো আমাদের সন্তান বেঁচে যেত। হয়তো মেহেরজান আজও আমার পাশে ঘুমাত।
এখন অবশ্য মেহেরজান আর বেলকনিতে যায় না।
কিছুদিন ধরে তার শরীর খারাপ যাচ্ছিল। চেয়েছিলাম ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। মেহেরজান যেতে চায়নি।
পরশু রাতে মেহেরজানের তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। সারারাত থরথর করে কেঁপেছে। তবুও হাসপাতালে যেতে রাজি হয়নি।
শেষরাতে সব কষ্ট-যন্ত্রনার অবসান ঘটিয়ে দম ছেড়েছে।
টিনের বাক্সে বারো হাজার টাকা জমা হয়েছে। আরো কিছু টাকা হলেই একটা গাড়ি কিনে আনব। সেটা মেহেরজানের জন্য উপহার।
মেহেরজান তখন আমার সাথে কথা বলবে। আমার পাশে ঘুমাবে। তাইতো ফ্রিজের ভেতরে রেখেছি তাকে। মেহেরজান ভালোই আছে। গতকাল সকালে যেরকম রেখেছিলাম, ঠিক সেরকম। এখন তার কষ্টও হচ্ছে না। শুধু তার হাত-পাগুলো একটু শক্ত হয়ে গেছে।
শখের গাড়ি
ইয়াছিন নাইম