ছোটগল্প

আমার ছোটোচাচা জিন দেখতে পেতেন

ইয়াছিন নাইম৬ অক্টোবর ২০২৬৫ মিনিট পড়া

আমার ছোটোচাচা জিন দেখতে পেতেন। লোকেরা বলত জিনেরা নাকি চাচার কথা শুনে। মাঝেমাঝে অনেক রাতে আমাদের টিনের চালে মোটা মোটা ঢিল পড়ত। চাচা আম্মাকে বলতেন,

"ভাবি, আজানরে নিয়া কোরআন শরিফ পড়েন। আমি দেইখা আসি কী হইছে।"

আমাদের ঘরের দক্ষিণ দিকে কলপাড়। সেখান গিয়ে বসতেন চাচা। কল চাপার শব্দ আসত। মনে হত কারা যেন পানি তুলে খাচ্ছে। অনেকগুলো গলা একসঙ্গে গুনগুন করে কথা বলার শব্দ শোনা যেত। মাঝেমাঝে ছোটোচাচার কণ্ঠও শুনতাম।


ছোটোচাচা বলতেন,

"পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বা। কোনোদিন মিছা কথা কইবা না। আর কলপাড়ে সাবধানে যাইবা।"

কলপাড়ের কথাটা বলার সময় চাচার ঠোঁটটা কেঁপে উঠত।

নামাজের কথা বলার সময় তার কণ্ঠে থাকতো আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি এবং অগাধ ভালোবাসা। কিন্তু কলপাড়ের কথা বলতে গিয়ে চাচা প্রতিবারই ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যেতেন।

নিমগাছের ডাল ভেঙে দাঁতে ঘষতে ঘষতে বলতেন,

"নিয়মিত মিসওয়াক করবা। মিসওয়াক করা সুন্নত।"


সন্ধ্যার আগেআগে আম্মা কলস নিয়ে পানি আনতে যেতেন। আমি জানতে চাইতাম,

"কলে এত পানি আসে কই থেকে, আম্মা?"

আম্মা বলতেন, "আল্লাহ দেন।"

কীভাবে দেন সেটা আর বলতেন না। বলতেন ছোটোচাচা। তার বলার ধরণেও আলাদা ভঙ্গি ছিল। লুঙ্গিটা ঠিক করে নিয়ে কুঁজো হয়ে বসতেন। তারপর আঙুল উঁচু করতেন আকাশের দিকে।

"আল্লাহ প্রথমে পানি দেন আসমানে। সেইখান থেইকা বৃষ্টি হয়ে জমিনে নামে। মাটির নিচে জমা হয়। সেই পানি পুকুরে যায়, খালে যায়, নদীতে যায়।"

"আর কলে?"

ছোটোচাচার ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে যেত।

"কলে আসে না। আসে কলের নিচে মাটির তলায়। কল চাপলে তলা থেইকা পানি উঠে আসে। মজার ব্যাপার কী, জানো?"

"কী চাচা?"

"এইযে নদীনালা, খালবিলে পানি আসে। এইসব আবার সূর্যের তাপে বাষ্প হইয়া আসমানে চলে যায়। এই পুরা বিষয়টারে বলে জলচক্র।"

"আর কলপাড়ের পানি? সেইটাও আসমানে যায়?"

চাচার মাথাটা নিচু হয়ে যেত। আচমকা কী একটা ভাবনায় গুম হয়ে যেতেন। ডাকলেও সাড়া দিতেন না।


ছোটোচাচা সারাক্ষণ শিলপাটা নিয়ে কুটকুট করে কীসব পাতালতা পিষতেন। জিজ্ঞেস করলেই বলতেন, "ওষুধ বানাই। জিন তাড়ানোর ওষুধ।"

একবার ছোটোচাচা দূরের একটা গ্রামে গেলেন চিকিৎসা করতে। যাবার সময় বলে গেলেন রাতে যদি তিনি ফিরে আসেন তাহলে যেন দরজা না খুলি। আম্মাকে আলাদাভাবে বুঝালেন,

"ভাবি, রাইতে যদি আমি আইসা ডাকি দরজা খুইলেন না কিন্তু।"


আমার তখন নয় বছর বয়স। ঘরে আমি আর আম্মা ঘুমাচ্ছিলাম। প্রায় মাঝরাতের দিকে দরজায় টুকা পড়ল।

মাত্র একটা টুকা।

আমি জানতাম ছোটোচাচা বাইরে। তাই ঘুমটা পাতলা ছিল। চোখ খুলে দেখি আম্মা বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন।

কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর চাচার গলা শুনতে পেলাম। পরপর দুবার তিনি আমার নাম ধরে ডাকলেন,

"আজান কইরে? আজান?"

আম্মা তখনও গভীর ঘুমে। অন্যদিকে তিনবার শব্দের পর আর কোনো সাড়াশব্দ নেই।

শীতের রাত। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে চাচার ঠাণ্ডা লেগে যাবে। তাই আমার গায়ের উপর থেকে আম্মার হাতটা সরিয়ে দিলাম। ধীরেধীরে নেমে গেলাম মাটিতে। তারপর দরজার সামনে।

ওদিকে বাইরেও কোনো সাড়াশব্দ নেই। শুধু চাঁদের আলোয় বাইরে থেকে দরজার নিচ দিয়ে একটা কালো ছায়া দেখা যাচ্ছে।

বুঝলাম ছোটোচাচা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের ঘুম ভাঙলে কষ্ট হবে ভেবে আর ডাকছেন না। কিন্তু আমি কি তাকে বাইরে রাখতে পারি?


এদিকে সিটকিনিটা একটুর জন্য নাগাল পাচ্ছি না। আম্মাকে ডাকব কি না আমতা আমতা করছি। ডাকলে যদি আম্মা রেগে যান?

আলনায় ঝুলিয়ে রাখা আম্মার কাপড়ের ব্যাগটা এনে দরজার সামনে রাখলাম। সেটার উপর দাঁড়িয়ে খুলে দিতেই ছোটোচাচার মুখটা চোখে পড়ল।

আনন্দে লেপ্টে আছে তার চেহারা। যেন দরজা খুলে দেওয়ায় খুব খুশি হয়েছেন। তিনি আমাকে কোলে তুলে নিলেন৷

আজ তার শরীর এত ঠাণ্ডা লাগছে কেন? মনে হচ্ছে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে চাচার হাত-পা সব বরফের হয়ে গেছে।

আরেকটা ব্যাপার লক্ষ করে আমার খুব অবাক লাগলো। চাচা সাধারণত তেমন লম্বা নন। কিন্তু আজ তাকে অনেক বেশি লম্বা লাগছে। এতটাই লম্বা, তার মাথাটা ঠেকেছে টিনের চালে।

ছোটোচাচা হঠাৎ এতটা লম্বা হয়ে গেলেন কীভাবে? কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।


পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙলো, গ্রামের সবার ঘুম ভাঙলো। শুধু আম্মার ঘুম ভাঙলো না। তার শরীরটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল সব রক্ত কে যেন শুষে নিয়েছে।

দুপুরে ছোটোচাচা ফিরলেন মহা খুশি হয়ে। তার রোগী ভালো হয়েছে। কিন্তু উঠানে এসেই এত মানুষের ভীড় দেখে তার পা থমকে গেল।

আমি আম্মার পাশে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিলাম। চাচা আমার কানের কাছে বললেন,

"কাল রাতে দরজা খুলছিলি?"

আমি কোনো জবাব দিতে পারিনি। বুঝতেও পারিনি কিছু। আগের রাতেই তো চাচা ঘরে ফিরেছিলেন। তাহলে দুপুরে আবার ফিরবেন কীভাবে?

আর আমি নিজেই তো দরজা খুলে তাকে আসতে দিয়েছিলাম৷ তাহলে এই প্রশ্ন করার মানে কী?


সেদিন কুয়েত থেকেও দুঃসংবাদ এলো। রোড এক্সিডেন্টে আব্বা মারা গেছেন। আব্বার লাশ এলো সতেরো দিন পর। জীবনে প্রথমবার তার চেহারা দেখলাম। ফ্যাকাশে, রক্তহীন একটা মুখ। ছোটোচাচা আমার হাতটা শক্ত করে ধরলেন। তার ঠোঁটে অস্ফুট স্বর বেরিয়ে এল,

"ভাইজানরে ও-ই মারছে। ও-ই মারছে আমার ভাইজানরে।"

বাবাকে শোয়ানো হলো আম্মার কবরের পাশেই। নামফলকে লেখা হলো, "মরহুম আকবর আলী, কুয়েত প্রবাসী"


তারপর থেকে ছোটোচাচা আর আমার সাথে কথা বলতেন না। শেষ কয়টা দিন চুপচাপ কলপাড়ে বসে থাকতেন। এক রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে বসলেন। একটি কোরআন শরিফ আমার হাতে দিয়ে বললেন,

"পড়তে থাক। রাইতে যদি আমি আইসা ডাকি দরজা খুলবি না। খেয়াল রাখবি কয়বার ডাকা হয়। যদি একবার অথবা তিনবার ডাকে তাইলে বুঝবি ওইটা আমি না।"

সেই যে চাচা গেলেন, আর ফিরলের না। লোকে বলে জিন চাচাকে নিয়ে গেছে। কেউ বলে চাচা জিনের সাথে চলে গেছেন। কেউ আবার বলে চাচাকে নাকি ছোটোবেলায় জিনেরা নিয়ে গিয়েছিল। এতবছর চাচার বেশ ধরে জিন আমাদের বাড়িতে ছিল।


এখন আমার বয়স উনত্রিশ। দূর গ্রামের একটি মেয়েকে বিয়ে করেছি। ওর নাম ফাতিমা। বাসর রাতেই ফাতিমাকে বলেছি, রাতে যদি কেউ দরজায় ডাকে, ভুলেও যেন সাড়া না দেয়।

আমার একটি ছোট্ট দোকান হয়েছে। চা-বিস্কিটের দোকান। বিকিকিনি ভালোই হয়। আগের কলটাও আর নেই। এখন মোটর বসিয়েছি। সুইচ দিলে ট্যাঙ্কিতে পানি জমা হয়। ট্যাপ ঘুরালেই কলকল করে পানি পড়ে।

ঘরটাও আর আগের মতো নেই। আগে তো টিনের বেড়া ছিল। এখন ইটের দেয়াল তুলেছি। উপরে রঙিন চাল।

আমাদের একটি কন্যাসন্তান হয়েছে। ওর বয়স এখন ছয়। নামটা রেখেছি আম্মার নামে। আমেনা। দেখতেও দাদির মতোই হয়েছে। ওর চোখের দিকে তাকালে মনে হয় আম্মা আমাকে দেখছেন।

ঘরের দরজায় এখন দুটো সিটকিনি দিয়েছি। নিচেরটা আমার মেয়ে কিছু একটার উপরে দাঁড়ালে নাগাল পেয়ে যাবে। উপরেরটা পাবে না। ঘুমানোর আগে দুটো সিটকিনি ভালোভাবে লাগিয়ে তারপর ঘুমাই।


আজ দোকানে অনেক খদ্দের ছিল। দোকান বন্ধ করে ফিরতে রাগ এগারোটা বেজেছে। দুবার ডাকতেই ফাতিমা দরজা খুলে দিলো। খাওয়া যতক্ষণে শেষ করেছি, ততক্ষণে ঘুমে আমার চোখ লেগে এসেছে। সিটকিনি দেখার কথা মনেই আসেনি।

ঘুম যখন ভাঙলো তখন অনেক রাত। একটা খটখট শব্দ পেয়ে উঠে বসে দেখি আমার মেয়ে আমেনা দরজার কাছে। একটা টুলের উপর দাঁড়িয়ে সিটকিনি খুলছে।

এক লাফে বিছানা থেকে নেমে ওকে থামাতে যাব, ততক্ষণে সিটকিনিটা খুলে গেল। আমার মনে পড়ল আজ রাতে সিটকিটি দুটো খেয়াল করতে ভুলে গিয়েছিলাম। ফাতিমা হয়তো একটি সিটকিনি লাগিয়েছিল। এখন খোলা দরজার ওপাশে যাকে দেখা যাচ্ছে, তাকে চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না।

অনেক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সেই ছোটোচাচা। সেই আগের মতো চেহারা। জড়িবুটির ঝুলিটা এখনও তার কাঁধে ঝুলছে। মুখে সেই অতি পরিচিত হাসি। শুধু উচ্চতা একটু বেশি। তার মাথাটা ঠেকেছে টিনের চালে।

ছোটোচাচা মাথা নিচু করে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। নিচু হয়ে আমার মুখ বরাবর তাকিয়ে বললেন,

"আমি তোরে নিতে আইছি আজান। যাবি না আমার সাথে?"

ওঝা

ইয়াছিন নাইম

সমাপ্ত
ইয়াছিন নাইম

লেখা

ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ধারাবাহিক গল্পের লেখক

ফেসবুকে মূল পোস্ট

আরও গল্প

এমন আরও কিছু

সব গল্প
ছোটগল্প

কালকে এক রিকশাওয়ালা মামা বলতেছে

কালকে এক রিকশাওয়ালা মামা বলতেছে, "মামা, বিয়া করছেন?" বললাম, "না।" আমার দিকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকালো। "বিয়া করেন নাই? তাইলে তাড়াহুড়া কইরা বাসায় যাইয়া কী করবেন?" "বউ ছাড়া কোনো কাজ থাকতে পারে না?" "কী যে কন না মামা! বউয়ের চাইতে বড়ো…

১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিট পড়া
ছোটগল্প

একটা লোক আমার স্ত্রীর নাম্বারে প্রতিদিন…

একটা লোক আমার স্ত্রীর নাম্বারে প্রতিদিন ফোন দেয়। ফোনটা সাইলেন্ট করা থাকে। যাতে আমি টের না পাই। আমার মনে হয় মেহেরজান রাতে ঘুমায় না। চোখ বন্ধ করে কল আসার অপেক্ষা করতে থাকে। এত রাতে সে কার সাথে কথা বলে? আর ওই নাম্বার "বাবা" নামে সেইভ করা…

১৩ অক্টোবর ২০২৬৭ মিনিট পড়া
ছোটগল্প

আমাদের বাড়িতে একটা দোষী পুকুর আছে

আমাদের বাড়িতে একটা দোষী পুকুর আছে। সেটার ভয়ে বাবা আমাদেরকে নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। এখন আবার সেখানে ফিরে যেতে হচ্ছে। বাবা যদি জানতে পারেন তাহলে ঘর থেকেই বেরোতে দিবেন না। তাই মিথ্যে বলে যাচ্ছি। বাবা জানে কক্সবাজার যাব। কিন্তু যাচ্ছি আমাদের গ্রামে। যে…

১২ অক্টোবর ২০২৬৮ মিনিট পড়া