বড়োআপার বিয়ে আটকে আছে অনেকদিন ধরে
ইয়াছিন নাইম১১ অক্টোবর ২০২৬৬ মিনিট পড়াবড়োআপার বিয়ে আটকে আছে অনেকদিন ধরে।
লোকে বলে এর পেছনে জিনের হাত আছে। আপাকে কেউ সন্দেহ করে না।
শুধু আমি জানি আপার সমস্যার কথা। এমন এক সমস্যা, যেটা কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে না।
ব্যাপারটা আমি লক্ষ করি এক মাস আগে। তখন আপার একটা গোপন বন্ধু ছিল। পাড়ার সবাই তাকে পলাশ নামে চিনত। শুধু বড়োআপা তাকে ডাকত চিকু নামে।
সন্ধ্যের আগেআগে আপা টিউশানি শেষ করে ফিরত। আসার পথে গোরস্থানের পেছন দিকটায় দেখা করত ওরা। এসব কেউ জানত না। শুধু আমি জানতাম।
একবার একটা ভালো জায়গা থেকে বিয়ের সম্বন্ধ এলো। মামা একরকম জোর করেই আপার টিউশানি বন্ধ করিয়ে দিলেন। ওদের দেখা করাও বন্ধ হয়ে গেল।
কোনোভাবেই যখন বাসা থেকে বের হতে পারছিল না, তখন আপা চিকুকে একটা চিঠি লিখল। সেটা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর।
সেদিন আপা বারবার বলেছিল চিঠিটা যেন আমি না খুলি।
কিন্তু নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি বরাবরই মানুষের আগ্রহ বেশি। আমিও নিজেকে সামলাতে পারলাম না। খুলে ফেললাম চিঠিটা। সেদিন প্রথমবার আপাকে সন্দেহ হলো।
চিঠিতে লেখা ছিল,
"চিকু, তুমি ওই করাতকলে আর যেও না।"
করাতকলটা ছিল চিকুর আড্ডাখানা। ওদের বন্ধুরা মিলে রাতভর কেরম খেলত।
ফিরতি চিঠিতে চিকু লিখেছিল,
"বোকা মেয়ে! তোমাকে দেখতে না পেরে আমি ছটফট করছি। আর তুমি আছো করাতকল নিয়ে!"
আমিও ভাবছিলাম, বড়োআপা এতকিছু থাকতে করাতকল নিয়ে লিখতে গেল কেন?
ব্যাপারটা বুঝলাম একদিন পর। খবর এলো করাতকলে দুর্ঘটনায় চিকু মারা গেছে!
আমার শরীরের লোম কাঁটার মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। অন্য কেউ হয়তো কাকতালীয় ভাবতো। কিন্তু আমি তো জানি ঘটনা কাকতালীয় নয়। কারণ আগের রাতে বড়োআপা চিকুর ছবি বুকে নিয়ে কাঁদছিল।
তবে কি আপা আগে থেকেই জেনে গিয়েছিল ব্যাপারটা? তাইতো নিষেধ করেছিল করাতকলে যেতে!
একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেছি। দেখি আপা গোসল করে বেরিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেদিন প্রথমবার শাড়ি পরতে দেখেছি তাকে।
আপার চুল থেকে টপটপ করে জল পড়ছিল। চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল কে যেন হলুদ মাখিয়ে দিয়ে গেছে।
সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম তার হাত দেখে। বড়োআপা একজোড়া সিটিগোল্ডের চুড়ি পরেছে। জিজ্ঞেস করলাম,
"আপা, এসব তো বিবাহিতরা পরে। তোর হাতে কেন?"
আপা তাড়াহুড়ো করে চুড়িগুলো খুলে ফেলল। অদ্ভুতভাবে বসল আমার পাশে। জন্মের পর থেকে আমরা দুই বোন একসাথে ঘুমাই। একই বিছানায়।
সেদিন প্রথমবার আপা আমাকে নতুন একটা কথা বলল।
"কাল থেকে তুই ওই রুমে ঘুমাবি।"
মা-বাবা মারা গেছেন সেই ছোটোবেলায়। মামা আমাদেরকে বড়ো করেছেন। কিন্তু আমরা যে বাসায় থাকি, সেটা মামার বাসা নয়। বাসাটা আমাদের বাবার।
মামা তার উকিল বন্ধুর সাথে একের পর এক যুক্তি বের করেই চলেছেন। কীভাবে আমাদের থেকে সম্পত্তি লিখিয়ে নেবেন, সেই পরিকল্পনা ইতোমধ্যে করেও ফেলেছেন।
এখন গলার কাঁটা হয়ে বসেছে বড়োআপা। তার বিয়েটা কোনোভাবে হচ্ছে না।
এদিকে আপার আচরণ দিনদিন আরো অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। মামা আমাদেরকে আলাদা ঘরে থাকার অনুমতি দেননি। কিন্তু আপা আর আমার সাথে এক বিছানায় শোয় না। মেঝেতে মাদুর পেতে ঘুমায়।
এক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। উঠে দেখি বড়োআপা চুপচাপ বসে আছে। তার পুরো শরীর ঘামে জবজবা। বললাম,
"আপা, স্বপ্ন দেখেছিস?"
আপা একরকম কেঁপে উঠে আমার দিকে তাকালো। সে হয়তো ভাবেনি আমি এত রাতে জেগে উঠব। কাঁপা ঠোঁটে বলল,
"তু... তুই ঘুমাসনি?"
"কাঁপছিস কেন? ভয় পেয়েছিস? উপরে আয়।"
আপা কোনো জবাব দিলো না। উপরেও এলো না। তার কাছে গিয়ে বললাম,
"চিকুর কথা মনে পড়ছে?"
আপা চট করে আমার মুখ চেপে ধরল।
"তুই কোন সাহসে ওই নাম মুখে নিস? ওকে শুধু আমি চিকু ডাকি। আর কোনোদিন যেন তোর মুখে এই নাম না শুনি।"
বলে আমার সামনে থেকে চলে গেল। সারাটা রাত বারান্দায় বসে কাটালো। একবার উঁকি দিয়ে দেখি বিড়বিড় করে কার সাথে যেন কথা বলছে। অথচ আশেপাশে কেউ নেই।
মামার শাস্তিটা হলো তিনদিন পরেই।
লোকের কথায় মামাও বুঝে গিয়েছিলেন, আপার বিয়ে না হওয়ার পিছনে অন্য কোনো কারণ আছে। তাইতো নিয়ে এসেছিলেন ওঝাকে।
লোকটা এসেছিল দূর গ্রাম থেকে। মাঝারি মতো চেহারা। কাঁধে একটা ঝোলাব্যাগ। তার নাকি অনেক ক্ষমতা। জিনেরা তার কথা শুনে। তাকে মান্য করে।
আমাদের বাড়িতে এসেই গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল লোকটা। আমি আড়াল থেকে সব দেখছিলাম। মামাকে বলছিল,
"আপনে জিনে বিশ্বাস করেন?"
"করি বলেই তো আপনাকে ডেকেছি।"
"কিন্তু এই বাড়িতে কোনো জিন দেখতেছি না। জিন থাকলে আমি ঘ্রাণ পাইতাম। পাইতাছি একটা গন্ধ। একটা বাজে পোড়া গন্ধ।"
"তার মানে?"
ওঝা উঠে দাঁড়িয়ে একবার চক্কর দিয়ে আবার বসল।
"মানুষ মরলে তার রুহানি উপরে চইলা যায়। কিন্তু কেউ যদি খুন হয়, তার রুহানি যাইতে চায় না।"
"একটু বুঝিয়ে বলেন।"
"এইসব কথা বুঝাইলেও আপনে বুঝবেন না। দুনিয়ায় এমন অনেক কিছুই আছে যা আমরা বুঝি না। তাই বইলা কি সেইগুলা নাই?"
বলতে বলতে ঝোলাব্যাগ থেকে কী একটা বের করতে করতে বলল,
"এই গেরামে এমন কোনো কারখানা আছে, যেখানে গাছ কাটা হয়?"
"আছে তো। জসিমের করাতকল।"
"ওইখানে আপনে যাইবেন না।"
"কেন? করাতকলে কী সমস্যা?"
মামার প্রশ্ন শুনে ওঝা মিটিমিটি হাসলো।
"আপনে সবই জানেন। জাইনাও অভিনয় করতাছেন। যাইয়েন না কিন্তু।"
"আচ্ছা।"
"না গেলেও আপনেরে তুইলা নিয়া যাইব। তাই এইটা লগে রাখবেন। মনে রাইখেন, কোনোভাবে যেন এইটা আপনার কাছ থেইকা না হারায়।"
ওঝার দেওয়া জিনিসটা মামা বালিশের নিচে রেখে ঘুমাতেন।
এক রাতে খটখট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। চেয়ে দেখি বড়োআপা চুপিচুপি দরজা খুলে বেরোচ্ছে। আমি ওর পিছু নিলাম।
আপা চোরের মতো মামার ঘরে ঢুকল। তারপর যা করল, তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।
আপা মামার বালিশের নিচ থেকে ওঝার দেওয়া জিনিসটা চুরি করছে কেন বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো পরদিন সকালে। যখন শুনলাম করাতকলে মামার লাশ পাওয়া গেছে।
ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটছিল, কোনোকিছু মিলাতে পারছিলাম না। এখন আমরা দুটি বোন আলাদা আলাদা ঘরে ঘুমাই। মামার শোকে মামি কখন উঠেন, কখন খান কিছু বুঝতেও পারি না।
অন্যদিকে সাজেদ নামের ছেলেটা প্রায়ই বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলেটা আমার থেকে দশ বছরের বড়ো। মরহুম চিকুর বন্ধু। একদিন গোপনে তার সাথে দেখা করলাম। সে শক্ত মুখে বলল,
"তুমি তোমার কথা রাখবে, না কি আমি সবাইকে সত্যিটা বলে দিব?"
"কোন সত্যি বলবেন আপনি?"
"বলব তুমি চিকুকে খুন করিয়েছ। তোমার কথায় আমি চিকুকে করাতের মেশিনে ফেলে মেরেছি।"
চট করে তার মুখটা চেপে ধরলাম।
"এসব জানাজানি হলে কিন্তু আপনারও জেল হবে।"
"হোক। আমি পরোয়া করি না। আমি শুধু তোমাকে চাই। একটা রাতের জন্য হলেও চাই। তা না হলে সবাইকে বলে দেব।"
"আচ্ছা। কোথায় আসতে হবে বলো।"
"করাতকলে।"
চমকে সাজেদের দিকে তাকালাম। এখন তার ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি। ইনিয়েবিনিয়ে বলল,
"আজ রাতে নাইট ডিউটিতে আমি একা থাকব। একটা সাদা জামা পরে এসো৷ সাদা আমার খুব পছন্দ।"
অনেক রাতে, যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, চুপিচুপি বের হয়ে গেলাম। করাতকল বেশি দূরে নয়। পায়ে হাঁটলে মিনিট দশেক লাগে।
চারপাশে অন্ধকার রাস্তা। অমাবস্যার আকাশ আর ঝিঁঝি পোকার ডাক মিলে মনে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। চলতে চলতে মনে পড়ছে সেই দিনের কথা, যেদিন আপা চিকুকে করাতকলে যেতে নিষেধ করে চিঠি পাঠিয়েছিল।
আপা জানতে পেরেছিল মামা তার বন্ধুর সাথে মিলে করাতকলে চিকুকে খুন করানোর বুদ্ধি করছেন৷ কারণ চিকু শিক্ষিত ছেলে। তার সাথে আপার বিয়ে হলে বাড়িটা আর দখল করা যাবে না।
তাই মামা চাচ্ছিলেন চিকুকে কীভাবে রাস্তা থেকে সরানো যায়। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছিলাম আমি।
আমার বয়স যখন তেরো, তখন থেকে চিকুকে পছন্দ করি। আঠারো বছরে পা দিতেই একদিন মনের কথা জানাই তাকে। কিন্তু চিকু আমাকে ফিরিয়ে দেয়। কারণ সে ভালোবাসে আমার বড়োআপাকে।
ওরা যখন লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করত, একজন আরেকজনের হাত ধরত, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখতাম। আমার বুকের ভেতরটা দাউদাউ করে জ্বলত।
আপা চিকুর সাথে পরিকল্পনা করছিল, শীঘ্রই তারা পালিয়ে বিয়ে করবে। আড়াল থেকে কথাটা শুনে আমার পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল। আমি যাকে ভালোবাসি, সে আমার আপার সাথে সংসার করবে, এটা আমার সহ্য হবে না।
তাই সুযোগ পেতেই কাজটা সেরে ফেলি। সাজেদ আমাকে অনেক আগে থেকে পছন্দ করত। প্রতিদিন আমার পিছুপিছু ঘরত। তাকে বলেছিলাম, একটা কাজ যদি করতে পারে, তাহলে এক রাতের জন্য আমি তার হয়ে যাব।
সাজেদ রাজি হয়ে গেল। করাতকলে অনেক রাত পর্যন্ত ওদের বন্ধুরা আড্ডা দিলো। সবাই বাড়ি চলে গেলে সাজেদ ইচ্ছে করে চিকুকে আটকে রাখল। তারপর সুযোগ বুঝে ফেলে দিলো চলন্ত মেশিনে।
সবাই ভাবল দুর্ঘটনা। আপা ভাবল মামা খুনটা করিয়েছেন৷ আমাকে কেউ সন্দেহও করল না।
করাতকলে এসে দেখি সাজেদ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। পাশের ঘরে একটা অল্প আলোর বাতি জ্বলছে। সেই আলো পড়েছে সাজেদের চেহারায়।
আমাকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালো। বলল,
"ঘরে যাও। আমি আসতেছি।"
ঘরের ভেতরে গেলাম। টিনের বেড়া দেওয়া ছোট্ট একটা ঘর। একপাশে একটা চৌকি। তার এক কোণে মশারি ভাঁজ করে রাখা। দুটো ময়লা বালিশ পড়ে আছে বিছানার মাঝখানে। সেগুলো জায়গামতো রাখতে গিয়েই পায়ে লাগলো জিনিসটা।
একটা ভেজা নরম কিছু। ভালোভাবে চেয়ে দেখি রক্তে আমার পা লাল হয়ে গেছে। চৌকির নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে সাজেদের কাটা মাথা!
আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। বাতিটা তুলে ধরে দেখি চৌকির নিচে ঠেসে রাখা সাজেদের পুরো শরীর। মাথাটা আলাদা।
তাহলে...
সাজেদ যদি এখানে থাকে, তবে বাইরে কে?
কাঁপতে কাঁপতে ফিরে তাকিয়ে দেখি দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে দুটো ছায়ামূর্তি। প্রথমটা সাজেদ। না, সাজেদ নয়। চেহারাটা পাল্টে চিকুর রূপ নিচ্ছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে বড়োআপা!
তবে কি বড়োআপা সত্যিটা জেনে গেছে?
করাতকল
ইয়াছিন নাইম